গাজা আবারও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, তারা ৩৭টি আন্তর্জাতিক এনজিওকে গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ১ মার্চ থেকে। এই এনজিওগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও আশ্রয় সহায়তা দিয়ে আসছিল।
নিষেধাজ্ঞার কারণ
ইসরায়েলি সরকার নতুন একটি রেজিস্ট্রেশন নীতি চালু করেছে, যেখানে প্রতিটি এনজিওকে তাদের কর্মীদের পূর্ণ বায়োডাটা ও নামের তালিকা জমা দিতে বলা হয়েছে। ৩৭টি এনজিও এই শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কারণ তারা মনে করে এটি মানবিক সহায়তার নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী।
Human Rights Watch জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বড় বাধা সৃষ্টি করবে।
এনজিওগুলোর প্রতিক্রিয়া
আল জাজিরা সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১৭টি এনজিও ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে তারা গাজা ও পশ্চিম তীরে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
– Doctors Without Borders, Save the Children, Oxfam, CARE International—সবাই বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা মানবিক বিপর্যয়কে আরও গভীর করবে।
– তারা বলছে, “আমরা কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নই। আমরা শুধু জীবন বাঁচাতে চাই।”
জাতিসংঘের অবস্থান
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা “গণহত্যার শিকার জনগণের জন্য জীবনকে আরও অসহনীয় করে তুলবে”।
তারা আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।”
গাজার বর্তমান অবস্থা
– শীতকালীন ঝড়ে হাজারো তাবু প্লাবিত হয়েছে।
– বিদ্যুৎ ও পানি সংকট চরম পর্যায়ে।
– চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি ভয়াবহ।
– খাদ্য সরবরাহ সীমিত, শিশুদের অপুষ্টি বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এনজিওগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা। তাদের কার্যক্রম বন্ধ হলে লাখো মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
– ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, “মানবিক সহায়তা বন্ধ করা আন্তর্জাতিক নীতির পরিপন্থী।”
– যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
– তুরস্ক ও জর্ডান এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
গাজায় এনজিও কার্যক্রম বহু বছর ধরে চলেছে। ২০০৮, ২০১৪, ২০২১—প্রতিটি সংঘাতের সময় তারা খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় দিয়ে লক্ষাধিক মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
এই প্রথম এত বড় সংখ্যক এনজিওকে একসাথে নিষিদ্ধ করা হলো।
বিশ্লেষকদের মতামত
– রাশিদ খালিদি (মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক): “এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল।”
– লিন্ডা থমাস (মানবাধিকার গবেষক): “এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং গণহত্যার প্রমাণকে ধ্বংস করার চেষ্টা।”
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রভাব
– মানবিক সহায়তা বন্ধ হলে গাজায় মৃত্যুহার বেড়ে যাবে।
– আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলো হয়তো ভবিষ্যতে গাজায় কাজ করতে ভয় পাবে।
– ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মামলা হতে পারে।
– ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
উপসংহার
গাজায় ৩৭টি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা। এটি শুধু ফিলিস্তিন নয়, পুরো বিশ্ব বিবেকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এখন সময় এসেছে—আন্তর্জাতিক মহল যেন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ
ভাবে দাঁড়ায় এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে।

