গভীর জঙ্গলে গোপন কেবিন: কীভাবে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়লেন এল মেনচো

অর্থের লেনদেন বা মাদক পাচারের রুট অনুসরণ করে নয়—বরং তাঁর ‘রোমান্টিক পার্টনার’-এর গতিবিধি নজরদারির মাধ্যমেই মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনী খুঁজে বের করে দেশের কুখ্যাত মাদকসম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে বেশি পরিচিত।

মেক্সিকোর নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, ওই নারী তাঁদের হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের জঙ্গলঘেরা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে একটি নির্জন কেবিনে আত্মগোপনে ছিলেন এল মেনচো। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত শুক্রবার থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন।

এল মেনচো ছিলেন কুখ্যাত মাদক চক্র কার্টেল হালিস্কো নিউ জেনারেশন (সিজেএনজি)-এর প্রধান। গত রোববার তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে মেক্সিকোর বিশেষ বাহিনী অতর্কিত অভিযান চালায়। অভিযানের সময় গোলাগুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।


কীভাবে শুরু হয় অভিযান

মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল রিকার্দো ত্রেভিয়া ত্রেহো সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, শুক্রবার গোয়েন্দারা এল মেনচোর প্রেমিকার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে শুরু করেন।

ওই ব্যক্তি এক নারীকে হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের তাপালপা শহরে এল মেনচোর সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যান। ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা পাহাড়ি এই শহর দীর্ঘদিন ধরেই এল মেনচোর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

শনিবার ওই নারী এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও এল মেনচো তাঁর দেহরক্ষীদের নিয়ে কেবিনে থেকে যান। তখনই তাঁকে ধরতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ অভিযান পরিকল্পনা করা হয়।


ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধ

রোববার ভোরে বিশেষ বাহিনী তাপালপায় পৌঁছালে এল মেনচো পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর দেহরক্ষীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়।

জেনারেল ত্রেহো জানান, কার্টেল সদস্যদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ছিল। সংঘর্ষে অন্তত আটজন সন্দেহভাজন কার্টেল সদস্য নিহত হন। পালানোর সময় গুলিতে এল মেনচো ও তাঁর দুই দেহরক্ষী গুরুতর আহত হন।

তাঁদের হেলিকপ্টারে করে গুয়াদালাহারার একটি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পথেই এল মেনচো ও তাঁর দুই দেহরক্ষীর মৃত্যু হয়। পরে তাঁদের মরদেহ মেক্সিকো সিটিতে পাঠানো হয়।


দেশজুড়ে সহিংসতা

এল মেনচোর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর মেক্সিকোজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ৩২টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে অন্তত ২০টিতে হামলার ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মহাসড়ক অবরোধ, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৬২ জন নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর ২৫ সদস্য প্রাণ হারান। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশ ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

উড়োজাহাজ ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো পর্যটক আটকে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শহরে আগুন ও ধোঁয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে।


আন্তর্জাতিক প্রভাব

মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও মানব পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল সিজেএনজি। এল মেনচোকে দীর্ঘদিন ধরে মেক্সিকোর অন্যতম নিষ্ঠুর অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

তাঁর মাথার দাম ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর মৃত্যুর ফলে মেক্সিকোর মাদক চক্রগুলোর ভেতরে নতুন করে ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে পারে।

মেক্সিকোর কর্মকর্তারা বলছেন, সোমবার বিকেল নাগাদ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে দেশজুড়ে যে আতঙ্ক ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটবে না।

এল মেনচোর বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অভিযানকে মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনীর বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি নতুন সহিংসতার ঝুঁকিও তৈরি করেছে—যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।